টিকা বেচে সেকেন্ডে হাজার ডলার মুনাফার ব্যবসা গুঁড়িয়ে দিতে পারে কোরবেভ্যাক্স

টিকা বেচে সেকেন্ডে হাজার ডলার মুনাফার ব্যবসা গুঁড়িয়ে দিতে পারে কোরবেভ্যাক্স

রয়েল ভিউ ডেস্ক:
করোনাভাইরাস মহামারির বিপর্যয় কারও কারও জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন—জার্মানির একটি ছোট্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেক এরই মধ্যে বিলিয়নিয়ার ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে।

কোভিড টিকার বাণিজ্য এখন অনেকটা অলিগার্কির খপ্পরে পড়ে গেছে। মূল ব্যবসা করছে ফাইজার, বায়োএনটেক ও মডার্না। বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে টিকা সরবরাহ করে বিপুল অর্থ কামাচ্ছে তারা, যেখানে দরিদ্র দেশগুলো জনগণের টিকা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে।

টিকার ন্যায্য বণ্টনের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স (পিভিএ)। গত নভেম্বরে তাদের একটি বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, ফাইজার, বায়োএনটেক আর মডার্না সম্মিলিতভাবে প্রতি মিনিটে ৬৫ হাজার ডলার মুনাফা করছে। সে হিসাবে সেকেন্ডে তাদের মুনাফা ১ হাজার ডলার। আর দিনে মুনাফা ৯৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। 

সে হিসাবে, চলতি বছর তাদের কর পরিশোধ-পূর্ব মুনাফা দাঁড়াবে ৩৪ বিলিয়ন ডলার! অথচ দরিদ্র দেশগুলোকে নির্ভর করতে হচ্ছে জাতিসংঘের টিকা বিতরণ উদ্যোগ কোভ্যাক্সের ওপর। সেখানে সরবরাহ ঘাটতি ভয়ানক। ফলে চলতি ওমিক্রন বা ভবিষ্যৎ ভ্যারিয়েন্টের জন্য এসব দেশের প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। এটি গোটা বিশ্বকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। 


এই পরিস্থিতিতে টিকা বাণিজ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক দলের উদ্ভাবন। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের শিশু হাসপাতালের ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্ট সেন্টার এবং বেলোরের ন্যাশনাল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহপরিচালক পিটার হোটেজ ও তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী মারিয়া এলেনা বোটাজ্জি উদ্ভাবন করেছেন ৯০ শতাংশ কার্যকর কোভিড টিকা। কোরবেভ্যাক্স নামের এই টিকার বিষয়ে পিটার হোটেজ বলেছেন, ‘আমরা এটা দিয়ে টাকা বানানোর চেষ্টা করছি না। আমরা শুধু চাই মানুষ টিকা পাক।’ 

এদিকে গত মঙ্গলবার এই টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে ভারত সরকার। ভারতে এই টিকা উৎপাদন করছে হায়দরাবাদভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি বায়োলজিক্যাল ই। এটিকে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্মের কোভিড টিকা। বায়োলজিক্যাল ই-কে বাণিজ্যিক লাইসেন্স দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টোনে বেলোর কলেজ অব মেডিসিন। উভয় উদ্ভাবক এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। 

উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে কোমর বেঁধে নেমেছে বায়োলজিক্যাল ই। ২০২২ সালে ১০০ কোটি ডোজের বেশি টিকা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা। এর জন্য হোটেজ এবং বোটাজ্জি ব্যক্তিগতভাবে এক পয়সাও নিচ্ছেন না। তবে তাদের কর্মস্থল বেলোর কলেজ যৎসামান্য ফি নেবে। 

ফাইজার-বায়োএনটেক বা মডার্নার সঙ্গে টেক্সাস শিশু হাসপাতালের তৈরি টিকা বাজারজাতকরণ কৌশলে আকাশ-পাতাল তফাৎ। তাঁদের কোরবেভ্যাক্সের কোনো পেটেন্ট (মেধাস্বত্ব) সীমাবদ্ধতা রাখা হচ্ছে না। তাঁরা ভারতের বায়োলজিক্যাল ই-এর মতো আরও কিছু কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছেন, যারা মুনাফার ধান্দা ছাড়া এই টিকা উৎপাদনে সম্মত। 

গবেষক ও উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য একটি স্বল্পমূল্যের ওপেন সোর্স (উন্মুক্ত ফর্মুলা) টিকা তৈরি করা। এটি যেন দামি এবং ফাইজার, মডার্নার মতো এমআরএনএ প্রযুক্তির সীমিত সরবরাহের টিকাগুলোর বিকল্প হয়ে ওঠে সেই চেষ্টাই চলছে। শুধু দরিদ্র ও টিকা সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্যই এটি উৎপাদন ও বাজারজাত করা হবে। এই টিকার বৈশ্বিক বণ্টন নিয়ে দুই উদ্ভাবক এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। 

সব ঠিকঠাক থাকলে সারা বিশ্বেই চুক্তিবদ্ধ ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো এই টিকার নিজস্ব সংস্করণ উৎপাদন শুরু করতে পারবে। টেক্সাস শিশুর হাসপাতালের এই টিকা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে পুরোনো ও পরীক্ষিত রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন প্রযুক্তি। সারা বিশ্বের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে এই প্রযুক্তিতে টিকা উৎপাদনে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছে। যেখানে এমআরএনএ বা নিষ্ক্রিয় ভাইরাস ব্যবহার করে টিকা উৎপাদন পদ্ধতিগুলো অপেক্ষাকৃত নতুন এবং বেশ জটিল।

অনেকে বলছেন, এই কোরবেভ্যাক্স দেখিয়ে দেবে কীভাবে টিকা উদ্ভাবন, উৎপাদন এবং বিশ্বব্যাপী বিতরণ করতে হয়। মহামারিকালে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রতিষেধকের উন্নয়ন ও বিতরণ ব্যবস্থার মডেল হয়ে উঠতে পারে কোরবেভ্যাক্স।